ধারাবাহিক উপন্যাস – প্রতি বৃহস্পতিবার ।
পর্ব-- ৪১
Them lady
poets must not marry ,pal.
Miss
Dickinson-fancy in Amherst bedding her,
Fancy a
lark with Sappho, a
Tumble in
the bushes with Miss Moore.
শব্দের তন্দুর
ফুটছে, সন্ধ্যার কলস ভরে ভরে উপচে পড়ছে গোলাপ নির্যাস-পৃথিবী মধুময়;মধুময়
রক্ত লাল সন্ধ্যার ধূলিকণা। বাভ্রবি ওর
ক্যামেরা-বন্দী করছিল এই সব সান্ধ্য
আলাপচারিতা। বাভ্রবি দিল্লি হাটে এসেছিল
একটি গানের অনুষ্ঠান শুনবে বলে এবং অবশ্যই সেই অনুষ্ঠানটিকে
ঘিরে একটি স্টোরি লিখবে বলে। বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল যখন,তখন
যথারীতি যুধাজিত তার অফিসে। গতকাল রাতে -বেশ অনেকটা রাতেই প্রকৃতি আমেরিকা থেকে ফিরেছে। ওকে রিসিভ করতে
সবাই মিলেই এয়ারপোর্ট যাওয়া। সকালে দেরী করে ওঠা--প্রাকৃত আর
প্রকৃতি অনেক দিন পর একত্রিত--সুতরাং ভাইবোনের গল্প, আড্ডা,খুনসুটি
চলেছে ভোর সাতটা পর্যন্ত। তারপর
দুজনে ঘুমোতে গিয়েছে। বাভ্রবি আজ
আর তাই একেবারেই সময় পায়নি ববিতার কাছে যাবার। ববিতার কথা ভাবতে ভাবতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল----
দিল্লি হাটে এলেই মনটা কেমন যেন ভাল হয়ে যায়-প্রকৃতিকে
বলেছিল সঙ্গে আসারজন্য-প্রকৃতি
গ্র্যান্ডির সাথে লনে খেলা করছিল--বল এনে ছুড়ে দিচ্ছিল আর গ্র্যান্ডি সেই বল টা মুখের নিয়ে আসছিল
--"দেখো, দেখো মা,গ্রান্ডি
কেমন হাসছে!"
প্রাকৃত আর প্রকৃতি দুজনেই হাসতে হাসতে খেলায় মেতেছিল।
সুতরাং বাভ্রবি একাই চলে
এসেছিল। গানের প্রোগ্রাম শেষ হতে বিজলি
গ্রিলের সামনে একটি টেবিলে বসে কফি
আর ফিস কাটলেট অর্ডার করতেই
ওর চোখ আটকে গেল সুন্দর নিমগাছের
নীচে সিমেন্টের বেঞ্চ এবং টেবিলে। কয়েকজন পুরুষ
এবং একজন মহিলা আড্ডা জমিয়েছেন
এবং কবিতা পড়ছেন। বেশ ইন্টারেস্টিং মনে
হলো বাভ্রবির। নিম গাছের ছায়া মেখে এক
কালো মার্জারী তরতরিয়ে উঠে যাচ্ছে মগ ডালে--এক তরুণ,চশমা পরা
কবি কাগজ দেখে হয়ত নতুন লেখা নিজের কবিতা
পড়ছেন-হাতে একটি আধপোড়া সিগারেট--এতোটা
দূর থেকেও সেই কবির ডেয়ার ভেডিল কণ্ঠ কানে এলো বাভ্রবির। মনে হলো এই কবিতার ভাষা
একেবারেই আলাদা। নাহ্! এদের সঙ্গে আলাপ
করতে হচ্ছে তো! গুটি গুটি পায়ে বাভ্রবি সিমেন্টের চাতালে--নিম গাছের ছায়াঘন কবিতা আড্ডায়।
--"যাবতীয়
মিডিয়া ক্লোন,এনটারটেনমেন্ট
ইন্ডাস্ট্রির বাইরে আমাদের কবিতা। আমাদের
কোন পাতঝড় বর্ণমালা নেই।
আমাদের কবিতা ভোগবাদী সেবায়
নিয়োজিত মার্কেটেবল আইটেম নয়। আমাদের কবিতা ভাষার
উৎসব। অভিধা এবং অভিব্যক্তির
ব্যাখ্যা হীন আনন্দ -উৎসব। ম্যাক্সিমিলিজম এবং মিনিম্যালিজমের সংকরতার
মিলনোৎসব। এই পরিস্থিতিতে কবিতার
বিষয় বস্তু জঁড়হীন (generless),সাহিত্য শাসকের
অনুশাসন থেকে মুক্ত (canonless) হয়ে ওঠে।
আমরা আমাদের কবিতাকে ডিন্যারেটিভাইজ করার
প্রয়াস করেছি,করছি যার
ফলে সেগুলো অপরিচিতির আদল পায়। আমাদের
কবিতার একটি বিশেষত্ব হচ্ছে সংকরতা-যা একটি সাংস্কৃতিক প্রতর্ক,যে
প্রতর্কটি অনেকানেক বৈশিষ্ট্যের উৎস-কেন্দ্র।"
শুনতে শুনতে বাভ্রবি যেন
অন্য একটি ডায়মেনশনে চলে যাচ্ছিল। এই কবি গোষ্ঠীরা যেহেতু দিল্লি হাটে বসে কবিতা
আড্ডা যাপন করেন তাই তারা নিজেদেরকে হাটুরে দিল্লি-কবি-গোষ্ঠী বলেন। তাদের
একটি নিজস্ব ম্যাগাজিন ও রয়েছে।-"হাট-দিল্লি"। বাভ্রবি
ওদের মধ্যে একমাত্র মহিলা কবি-যার
নাম -তৃষ্ণা--তাকে জিজ্ঞেস করল--"কিছু মনে করবেন না,আপনাকে
একটি প্রশ্ন করব?"
মৃদু হেসে কবিতা লেখা
কাগজটি সিমেন্টের টেবিলে রেখে তৃষ্ণা বললেন--"কিছুই মনে করব না। অবশ্যই প্রশ্ন করুন।"
--"আচ্ছা,এই যে আপনি একাকী একজন ফিমেল পোয়েট এখানে সাতজন পুরুষ কবির মাঝখানে বসে কবিতা পাঠ করছেন,আলোচনা
করছেন আপনার কি কখনও মনে হয়েছে যে আপনি odd man
out? মানে আমি বলতে চাইছি--"
তৃষ্ণা এবার হেসেই জবাব
দিল--"দেখুন এই প্রশ্নের সম্মুখীন
আমি অহরহ হচ্ছি। আজ এই দিল্লি
হাটেই প্রথম নয়--আমি যখন কলেজে পড়ি তখন থেকেই
আমি কখনোই নিজেকে একজন নারী
মাত্র না ভেবে মানুষ ভেবে এসেছি। যে দেশে
-"অর্ধনারীশ্বর-"মূর্তির কল্পনা
ভাস্কর্যে পরিণত-সে দেশে এই প্রশ্নটা কেন
উঠে আসে--সেটা ভেবেই আমি অবাক হই। তথাকথিত সভ্যতার
সৃষ্টির বহু আগে এই পোষ্ট
জেন্ডার ভাবধারার সৃষ্টি হয়েছিল
যে দেশে-সেই দেশে এই জেন্ডার ডিসক্রিমিনেশন কিভাবে এলো--এটা নিয়েই বোধহয় সমীক্ষার প্রয়োজন।"
বাভ্রবির মুখে প্রশংসার আলো--সে কিছু বলার আগেই
পাশে বসে থাকা চশমা পরা একজন দীর্ঘ ছিপছিপে
মাঝবয়সী কবি সস্নেহে তৃষ্ণার মাথায় হাত ছুঁইয়ে বললেন--"বড়
সুন্দর বললি রে বোন। দাঁড়া,কবিরাজী
কাটলেট আর চা বলি--"
সবাই জোরে হেসে উঠলেন।
বাভ্রবির ভীষণই ভাল
লাগল। সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল-"আপনারা
বসুন,আমি তাহলে--"
সবাই হই হই করে উঠলেন
--"আরে আরে
যাচ্ছেন কোথায়? সুগত দা আপনার জন্যও চা এবং কাটলেট অর্ডার করেছেন।"
বাভ্রবি হেসে আবার বসে পড়ে বলল--"আপনার নাম সুগত?"
এবার তৃষ্ণা মৃদু হেসে বলল--"উনি সুগত
দত্ত গুপ্ত--দারুণ কবিতা লেখেন--"
সুগত দত্ত
গুপ্ত নমস্কার জানিয়ে বললেন--"এখানে-এই যে আমরা সাত ভাই চম্পা আর একটি পারুল বোন আছি--আমরা সবাই ভিন্ন
স্বাদের,ভিন্ন আঙ্গিকে কবিতা লিখি। আর বাণিজ্যিক,ক্লোন
মাফিয়া সাহিত্য থেকে আলাদা একটি ঘরানায়
লিখি।"
বলতে বলতে চা এবং
কবিরাজি কাটলেট--
তৃষ্ণা চায়ে চুমুক দিয়ে কবিতার
পাতায়
--"যে
লিপিতে লেখা হয়নি আজও
সেই লিপিদের
সম্ভাবনাময় জন্ম লগ্ন লেপটে আছে,পাথরের,জীবাশ্মে
সোনালী শীতলতার আঁশটে আঁচলে
চোখ তার কবেকার ব্যবিলন
নগরী
মুখ তার হরপ্পার কারুকার্য
এখানে সাম্রাজ্যবাদ নয়
যাদুঘরের প্রাচীন
ভালবাসার স্বপ্নময় এক কবি
পাতাদের, ঢেউ খেলানো
সাগরিক নীল লেয়ারদের
পাহাড়দের সরতাজের
লিথোগ্রাফ আঁকতে তুলে আনে
সেই সব
লিপিবালিকাদের।"
আকাশের রঙ বদল হতে থাকে-দিল্লি হাটে নাগরিক সন্ধ্যার
হল্লাবোল--
বাভ্রবির মুঠোফোন
বেজে ওঠে
একাকী হাঁটছিল বাভ্রবি-তাঞ্জোর পেইন্টিং এ ছোপ ছোপ স্বর্ণাভা--
--"হ্যালো।"
--"বৌদি,আমি
রূপালী বলছি--আপনার বাড়িতে একটু আসব?"
-রূপালী? যুধাজিতের কলিগ
সপ্তর্ষির স্ত্রী।
-"অবশ্যই রূপালী।
তুমি আধঘণ্টা পর চলে এসো।আমি এখন দিল্লি
হাটে। জাস্ট প্যাকিঙের দিকে হাঁটছি---"
-"ওকে
বৌদি।"
চুপচাপ সন্ধ্যার
সাজবদল এবং সেজে ওঠা বিপণি সম্ভার
দেখতে দেখতে পার্কিং লটের দিকে হাঁটতে থাকে বাভ্রবি-।
ক্রমশ …………
৪২তম পর্ব পড়ুন আগামী বৃহস্পতিবার
লেখিকার অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন ।
লেখিকার পরিচিতি
–
জন্ম-কলকাতায় । আসামের বরাক উপত্যকায় বড় হয়ে ওঠা ।
প্রকাশিত
গ্রন্থ
১--সাপ শিশির
খায় (গল্প গ্রন্থ)
২--দেবী দহন--(কবিতা গ্রন্থ)
ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্র পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ।