অসীম রায়
জন্ম ৭ মার্চ ১৯২৭। মৃত্যু ৩
এপ্রিল ১৯৮৬। কথাসাহিত্যিক। পেশায় সাংবাদিক। তাঁর উপন্যাস বুদ্ধিদীপ্ত-নিছক
আনন্দদানের জন্য লেখা নয়। কোনো বড়ো প্রকাশক তাঁর জীবিতকালে এগিয়ে আসেননি বই
প্রকাশের জন্যে। প্রথম দিকে প্রায় নিজের খরচেই বই বের করতে হয়েছে। বড্ড সিরিয়াস
বলে বদনাম আছে। একজন সমালোচকের অভিযোগ, তাঁর
লেখায় গল্প গৌণ। হয়তো এইসব কারণেই পাঠক কম। অথচ তাঁর লেখায় জ্ঞানগর্ভ মন্তব্য নেই, বিতর্ক
নেই। সমস্যা আছে, প্রশ্ন আছে, কিন্তু
সমস্তই নীচু পর্দায়। তাঁর লেখার আর-এক বৈশিষ্ট্য, এর
অধিকাংশই আত্মজৈবনিক। গদ্য আদ্যন্ত শহুরে, সন্দীপন
চট্টোপাধ্যায়ের মতো লেখকও তাঁর গদ্যকে শিক্ষণীয় মনে করতেন। উল্লেখযোগ্য উপন্যাস:
গোপালদেব, আবহমানকাল ইত্যাদি।
কবিতা-প্রবন্ধ এসবও লিখেছেন কিছুকিছু। প্রথম বইটিই তো কাব্যগ্রন্থ।
আখতার মহল সৈয়দা খাতুন
জন্ম ১৯০১ সালে ফরিদপুর
জেলার এক সম্পন্ন পরিবারে। মৃত্যু ১৯২৮ সালে অকালে। উকিল পিতার কনিষ্ঠ কন্যা। ভাই
মুজিবুর রহমান ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে প্রবেশকারী প্রথম বাঙালি মুসলমানদের একজন।
বিদ্যাশিক্ষা বাড়িতে গৃহশিক্ষকের কাছে। বারো বছর বয়সে বিবাহিত। যে-যুগে মুসলমান
মেয়েদের জন্য বাংলা পড়া নিষিদ্ধ ছিল, সেই
অনগ্রসরতার কালের লেখক। তাঁকে লিখতে হয়েছে গোপনে, কারণ
লেখালেখিতে শ্বশুরবাড়ির সায় ছিল না। সংক্ষিপ্ত জীবনে মাত্র দুটি উপন্যাসই লিখতে
পেরেছেন, যার মধ্যে একটি স্পষ্ট কারণেই ছদ্মনামে। কুড়ির দশকের মাঝামাঝিতে তাঁর কিছু
লেখা, কবিতা-প্রবন্ধ-উপন্যাসাদি ছাপা হয় সওগাত, নওরোজ, মাতৃমন্দির
ইত্যাদি পত্রিকায়। সমাজের কঠোর অনুশাসনে থেকেও তাঁর লেখায় ছিল রোকেয়াসদৃশ দীপ্ত
প্রতিবাদ। নিয়ন্ত্রিতা উপন্যাসে বিবাহ-বহির্ভূত রোমান্টিক প্রেমের সমস্যার কথা
তুলে ধরেছেন সাহসের সঙ্গে। আবুল ফজল তাঁর শক্তিমান ভাষা ও বেগবান বর্ণনাভঙ্গির
গুণে মুগ্ধ। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনও সহমত যে, কোথাও
বিরক্তিকর দীর্ঘসূত্রিতা নেই। মৃত্যুর বহুকাল পরে উত্তরসূরিদের চেষ্টায় প্রকাশিত
হয় তাঁর রচনাসংগ্রহ নিয়ন্ত্রিতা (১৯৭৯)।
আনন্দ বাগচী
জন্ম ১৫ মে ১৯৩২ পাবনা জেলার
স্বাগতা গ্রামে। মৃত্যু ৯ জুন ২০১২ কল্যাণীর এক নার্সিংহোমে। মূলত কবি, তবে গদ্যও
লিখতেন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ। কর্মজীবন শুরু অধ্যাপনা দিয়ে
বাঁকুড়া খ্রিস্টিয়ান কলেজে। ষোলো বছর অধ্যাপনার পর সাহিত্যের মূলধারার টানে কলেজ
এবং বাঁকুড়ার বাড়ি ছেড়ে চলে আসেন কলকাতায় দেশ পত্রিকায় চাকরি নিয়ে। যদিও তাঁর সেই
স্বপ্ন সফল হয়নি। নিয়মিত কবিতা লিখলেও প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ সাকুল্যে পাঁচটি। এই
সঙ্গে আছে দুটি কাব্য-উপন্যাসও। তবে উপন্যাস, কিশোর
সাহিত্য, গোয়েন্দা কাহিনি, গল্পগ্রন্থ, রম্যরচনা, অনুবাদগ্রন্থ, প্রবন্ধগ্রন্থ, নাটক
ইত্যাদি মিলিয়ে গদ্যের বই তুলনায় অনেক বেশি, ছত্রিশটির
মতো। কৃত্তিবাস পত্রিকার শুরুর দিকে সম্পাদক হিসেবে তাঁর নামও থাকত। পরে বাঁকুড়া
বাসকালে পারাবত ও বৃশ্চিক নামে দুটি লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেছেন। সম্পাদিত বই
প্রথম সাড়া জাগানো কবিতা। জীবনে কোনো বড়ো পুরস্কার পাননি। কিন্তু তা বলে, পাঠক
স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাওয়ার মতো কবিও নন। আলোক সরকারের ভাষায়, কোনো
চিন্তিত কাব্যপ্রকরণের দিকে আকর্ষণ অনুভব করেননি, তা হলেও
তাঁর কবিতা চিরদিনের কবিতার সঙ্গে একটা রক্তসূত্র নিয়েই জন্মেছিল। শেষ বয়সে
বাক্রদ্ধ ও স্মৃতিশক্তিরহিত অবস্থায় লোকচক্ষুর অন্তরালে হালিশহরের বাড়িতে দীর্ঘদিন
শয্যাশায়ী ছিলেন।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
জন্ম ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৩
রংপুর জেলার গোটিয়া গ্রামে মামাবাড়িতে। মৃত্যু ৪ জানুয়ারি ১৯৯৭ ঢাকায়।
কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক। যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে লিখতেন। ফলে গ্রন্থসংখ্যা কম।
উপন্যাস মাত্র দুটি-মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় লেখা চিলেকোঠার সেপাই এবং তেভাগা
আন্দোলনের পটভূমিতে খোয়াবনামা। এ ছাড়া কয়েকটি গল্পসংকলন এবং একটি প্রবন্ধগ্রন্থ, এই তাঁর
সাহিত্যজীবনের মোট ফসল। কিন্তু অল্প লিখেই প্রায় কাল্ট-ফিগার হয়ে উঠেছেন দুই
বাংলার তরুণ লেখকদের কাছে। বাংলাদেশের হাতে-গোনা যে-কজন লেখক পশ্চিমবঙ্গের বিদগ্ধ
মহলে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন তিনি তাঁদের অন্যতম। তাঁর গল্প-উপন্যাসে দেদার রঙ্গশ্লেষ
আর যৌনতার খোলামেলা বিবরণ। সেটা অবশ্য সস্তা কোনো জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভে নয়। শ্লেষ
এবং যৌনতাকে প্রতিবাদ হিসেবে ব্যবহার করেছেন তিনি। বাংলা গল্প-উপন্যাসে যে-একরৈখিক
বিবরণের সঙ্গে আমরা পরিচিত, তিনি সেই পথের যাত্রী ছিলেন
না!
আনম বজলুর রশীদ
জন্ম ৮ মে ১৯১১ ফরিদপুর
শহরে। মৃত্যু ৮ ডিসেম্বর ১৯৮৬ ঢাকায়। কবি, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার
ও প্রাবন্ধিক। শুধু যে জন্ম ২৫ বৈশাখ তা-ই নয়, বাল্যকাল
থেকেই রবীন্দ্রানুসারী। পিতা ও ভগিনী-সহ তাঁদের গোটা পরিবারই রবীন্দ্র-অনুরাগী।
একসময় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর পত্র-বিনিময় হয়েছিল, পরে
কিছুকাল সস্ত্রীক বাসও করেছেন শান্তিনিকেতনে এবং তাঁর একাধিক বই আছে রবীন্দ্রনাথকে
নিয়ে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, পাকিস্তান
সরকার বেতার ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধের আদেশ দিলে তা সমর্থন করে
বসেন! জীবন শুরু শিক্ষকতা দিয়ে, পরে
অধ্যাপনা। উচ্চশিক্ষা আমেরিকায়। ইয়োরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ঘুরেছেন। নাট্যকার
হিসেবেই খ্যাতি বেশি এবং বাংলা একাডেমী পুরস্কারও পেয়েছেন নাটকের জন্যই।
উল্লেখযোগ্য নাটক: উত্তরুণ, রূপান্তর, ধানকমল
ইত্যাদি।