অক্ষয়কুমার দত্ত
জন্ম ১৫ জুলাই ১৮২০ বর্ধমান জেলার চুপী গ্রামে। মৃত্যু ১৮ মে ১৮৮৬।
প্রাবন্ধিক। ব্রাহ্মধর্মে প্রথম দীক্ষিতদের একজন। পরে অজ্ঞেয়বাদী। দীর্ঘকাল
তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-র সম্পাদক। বাংলা প্রবন্ধসাহিত্যের পথিকৃৎ হিসেবে গণ্য।
বাংলা ভাষায় পাশ্চাত্য রীতিতে বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লেখায় অগ্রণী। বাংলায় প্রথম
ভাষাতত্ত্ব ও প্রকৃতিবিজ্ঞানের গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ লেখায়ও তাঁর কৃতিত্ব
অনস্বীকার্য। লেখার ভঙ্গি বিষয়ানুগ, প্রকাশক্ষম, বাহুল্যবর্জিত ও প্রসাদগুণসম্পন্ন। দেশ থেকে অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার, কদাচার ও দুর্বলতা দূর করাই ছিল তাঁর
জীবনের প্রধান ব্রত। বাংলা ভাষার মাধ্যমে সমস্ত বিষয় পড়ানোর পক্ষপাতী ছিলেন।
ভারতবর্ষীয় উপাসক-সম্প্রদায় নামে গবেষণা-গ্রন্থটি তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম হিসেবে
বিবেচিত। এর উপক্রমণিকায় আর্যভাষা ও সাহিত্যের তিন প্রধান শাখা (ইন্দো-ইউরোপীয়,
ইন্দো-ইরানীয় এবং সংস্কৃত) নিয়ে গভীর আলোচনা আছে। লেখকের চারুপাঠ
বইটি একসময় শিশুপাঠ্য হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। শিরোরোগের কারণে স্কুলের
প্রধান শিক্ষকের চাকরি ছাড়তে হয়, কিন্তু এর পরেও অনেক কাজ
করে গিয়েছেন অবাধে। অক্ষয়কুমার বড়াল জন্ম ১৮৬০ সালে কলকাতায়। মৃত্যু ১৯ জুন ১৯১৯।
কবি। রবীন্দ্রনাথের মতোই বিহারীলাল চক্রবর্তীর ভাবশিষ্য। কিন্তু কাব্যের
প্রকাশভঙ্গি, শব্দচয়ন ও বিষয় নির্বাচনে রবীন্দ্রনাথের
প্রভাবমুক্ত। তবে রবীন্দ্র-বিরোধীও নন। আত্মগত কল্পনামূলক প্রেম ও সৌন্দর্যবাদের
ওপর কবিতা রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। শব্দচয়ন ও বাক্যনির্মাণে পরিমিতি এবং
ভাবপ্রকাশে স্বচ্ছতা তাঁর লেখার বৈশিষ্ট্য। প্রথম দিকের কবিতায় দুঃখের সুরই বেশি।
স্ত্রীর স্মৃতিচারণ করে লেখা এষা কাব্যগ্রন্থে গার্হস্থ্য-জীবনের ও
নারী-প্রেমের ছবি তুলে ধরেছেন দক্ষতার সঙ্গে। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ
শোককাব্য এটি।
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়
জন্ম ১ মার্চ ১৮৬১ কুষ্টিয়া জেলার সিমুলিয়া গ্রামে। মৃত্যু ১০
ফেব্রুয়ারি ১৯৩০। ইতিহাসবিদ ও লেখক। বাংলা ভাষায় প্রাচীন লেখমালা, মুদ্রা ও অন্যান্য দলিল- দস্তাবেজের সাহায্যে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ইতিহাস
রচনায় পথিকৃৎ। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে আধুনিক বাঙালি লেখকদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় মনে
করতেন। তাঁর একটি সাড়া-জাগানো বই সিরাজদ্দৌলা। ইংরেজ ঐতিহাসিকেরা ব্রিটিশ শাসকদের
স্বার্থে সিরাজের চরিত্রে যথেচ্ছ কালিমা লেপন করেছেন। অক্ষয়কুমার তাঁর গবেষণার
সাহয্যে নবাবের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো খণ্ডন করার চেষ্টা করেন। অন্ধকূপ হত্যার ঘটনা
যে অলীক সেটা তাঁর লেখায় প্রমাণিত। বাংলার পাল রাজত্বকাল সম্পর্কেও বহু অজ্ঞাত
তথ্য আবিষ্কার করেছিলেন। তাঁর গৌড়লেখমালা গ্রন্থে এসবের বিবরণ আছে। একটি ত্রৈমাসিক
পত্রিকাও প্রকাশ করতেন ঐতিহাসিক চিত্র নামে। বাংলার প্রাচীন ইতিহাসের উপকরণ সংগ্রহ
ও সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে রাজশাহিতে বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি স্থাপন তাঁর আর-এক মহৎ
কীর্তি। সারা জীবন ইতিহাস নিয়ে চর্চা করলেও পেশায় ছিলেন আইনজীবী। ক্রিকেট খেলা,
শিল্পকলা এবং রেশমশিল্পেও আগ্রহ ছিল।
অক্ষয়চন্দ্র সরকার
জন্ম ১১ ডিসেম্বর ১৮৪৬ হুগলি জেলার চুঁচুড়া শহরে মামাবাড়িতে। মৃত্যু
২ অক্টোবর ১৯১৭। প্রাবন্ধিক ও কবি। সাপ্তাহিক সাধারণী এবং নবজীবন পত্রিকার
সম্পাদক। পড়াশোনা হুগলি কলেজিয়েট স্কুল, হুগলি কলেজ ও
প্রেসিডেন্সি কলেজে। পেশা ওকালতি। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ-এর সহকারী সভাপতি এবং
বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলন-এর চট্টগ্রাম অধিবেশনের মূল সভাপতি। জাতীয়তাবোধ, স্বাদেশিকতা ও হিন্দুধর্মের আদর্শে অনুপ্রাণিত। সারদাচরণ মিত্রের
সহযোগিতায় প্রাচীন কাব্য সংগ্রহ বের করেন। কবিতা লিখলেও প্রবন্ধেই তাঁর
সাহিত্যক্ষমতা প্রকাশ পেয়েছে বেশি। তার প্রধান নিদর্শন সমাজ সমালোচনা এবং রূপক
রহস্য বই দুটি। শিশুদের জন্য লিখেছিলেন যুক্তাক্ষরবর্জিত কাব্যগ্রন্থ গোচারণের মাঠ,
যা সেই আমলে তাঁকে যথেষ্ট খ্যাতি দিয়েছিল।
অখিল নিয়োগী (স্বপনবুড়ো)
জন্ম ২৫ অক্টোবর ১৯০২ ময়মনসিংহে। মৃত্যু ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩।
শিশুসাহিত্যিক। আর্ট কলেজ থেকে পাস করে কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু।
পরে চলচ্চিত্রশিল্পের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিভিন্ন সময়ে অঙ্কনশিল্পী, গীতিকার, চিত্রনাট্যকার, নির্দেশক,
অভিনেতা ইত্যাদির দায়িত্ব পালন। ক্ষিতীশচন্দ্র ভট্টাচার্যের সঙ্গে
মাসপয়লা নামে ছোটোদের জন্য একটি পত্রিকাও সম্পাদনা করেছেন। কিন্তু আসল খ্যাতি
যুগান্তর পত্রিকায় 'ছোটদের পাততাড়ি' বিভাগের
লেখক ও পরিচালক হিসেবে। ছোটোদের জন্য গানও লিখতেন স্বপনবুড়ো নামে এবং ক্রমে এই
নামেই বেশি পরিচিত হন। আন্তর্জাতিক শিশুরক্ষা সমিতির আমন্ত্রণে ভিয়েনা ঘুরে এসে
সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারেনামে যে-বইটি লেখেন তাতেই প্রথম নেতাজির স্ত্রী ও কন্যার
কথা জানা যায়।
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
জন্ম ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯০৩ নোয়াখালি শহরে। মৃত্যু ২৯ জানুয়ারি ১৯৭৬
কলকাতায়। কল্লোল-গোষ্ঠীর লেখক। শুরুতে রবীন্দ্রবিরোধী, পরে রবীন্দ্রভক্ত হয়ে যান। প্রথম বই বেদে আঙ্গিক, রচনাভঙ্গি
ও বিষয়বিন্যাসে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এক বিশিষ্ট উপন্যাস। মূলত কথাসাহিত্যিক
হলেও জনপ্রিয়তা পেয়েছেন জীবনীগ্রন্থ পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লিখে। স্মৃতিকথা
কল্লোল যুগ কল্লোল-সাহিত্য এবং কল্লোলীয় লেখকদের সম্পর্কে দলিলস্বরূপ। ১৯৭৫-এ
উত্তরায়ণ কাব্যগ্রন্থের জন্য রবীন্দ্র পুরস্কারে সম্মানিত হন। তিনি যে সব্যসাচী
লেখক এবং সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় সমান সফল ছিলেন, তা এই
ক-টি তথ্য থেকেই স্পষ্ট। রোমান্টিকতা ও গণচেতনা তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য।
মুনসেফ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে পরে জেলা জজ হয়েছিলেন এবং বিচারবিভাগে চাকরির
সূত্রে ঘুরেছেন বাংলা দেশের বিভিন্ন জেলায়। সেইসব বিচিত্র অভিজ্ঞতা ধরা পড়েছে তাঁর
বিভিন্ন গল্প-উপন্যাসে।
অজিতকুমার দত্ত
জন্ম ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯০৭ ঢাকা-বিক্রমপুরে। মৃত্যু ৩০ ডিসেম্বর ১৯৭৯।
কবি, সম্পাদক ও অধ্যাপক। কল্লোল-এর নিয়মিত লেখক। একসময়
বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে বের করেছেন প্রগতি পত্রিকা, পরে কবিতা
পত্রিকারও শুরুর দিকে যুগ্ম-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। নিজেরও দিগন্ত নামে একটি
পত্রিকা ছিল। দিগন্ত পাবলিশার্স নাম দিয়ে একটি প্রকাশনা সংস্থাও খোলেন। আধুনিক
বাংলা কবিতার স্থপতিদের একজন মনে করা হয় তাঁকে। তাঁর কবিতা প্রেমের সৌরভে স্নিগ্ধ।
লেখার ভঙ্গি স্বচ্ছ ও সরল, কণ্ঠস্বর কোমল ও মৃদু। সনেট লেখায়
বিশেষ দক্ষতা ছিল। কবিতা বাদে কিছু রসরচনা, ব্যক্তিগত গদ্য,
অনুবাদ, প্রবন্ধ ইত্যাদিও লিখেছেন। বাংলা
সাহিত্যে হাস্যরস তাঁর একটি মূল্যবান গবেষণাগ্রন্থ।
অজিতকৃষ্ণ বসু
জন্ম ৩ জুলাই ১৯১২ ঢাকায়। মৃত্যু ৭ মে ১৯৯৩। ব্যঙ্গ ও কৌতুক রসের
কবিতা এবং গল্পলেখক হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া বেশ কিছু উপন্যাসও আছে তাঁর। বাংলায়
অনুবাদ করেছেন মার্ক টোয়েন ও ন্যাথানিয়েল হথর্নের বই। ছোটোদের জন্যও লিখেছেন।
কিন্তু বাংলা সাহিত্যে তাঁর বিশিষ্টতা, জাদুকরদের বিচিত্র
জীবন ও নানা কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা নিয়ে লেখা যাদুকাহিনী-র জন্য। নিজেও ম্যাজিক
জানতেন; জাদুসম্রাট পি সি সরকার সিনিয়র ছিলেন তাঁর বন্ধু। এ
ছাড়া, সংগীতেও পারদর্শী। ওস্তাদ কাহিনী বইতে তাঁর
সংগীতজীবনের কথা এবং বহু বিশিষ্ট ওস্তাদের চিত্তাকর্ষক বর্ণনা আছে। গানও লিখতেন।
স্মৃতির স্মরণিকা নামের অ্যালবামে তাঁর লেখা গান গেয়েছেন অনুপ ঘোষাল। চাকরি করতেন
বিজ্ঞাপন সংস্থায়, গরে অধ্যাপনায় যোগ দেন।
অতুল সুর
জন্ম ৫ আগস্ট ১৯০৪। মৃত্যু ২ জানুয়ারি ১৯৯৯। বাংলা ও ইংরেজি দুই
ভাষাতেই লিখেছেন। মোট বইয়ের সংখ্যা দেড় শতাধিক। প্রবন্ধ লিখেছেন বিস্ময়কর সংখ্যায়, প্রায় হাজার দশেক। ইতিহাস ও অর্থনীতি মূল বিষয় হলেও আগ্রহ ছিল অন্যান্য
বিষয়েও। পেশা বদলেছেন বারে বারে। কখনও অধ্যাপক, কখনও
সাংবাদিক, তো কখনও স্টক এক্সচেঞ্জের উপদেষ্টা। একসময়
মহেন-জো-দারোয় প্রত্নতত্ত্বের কাজেও যুক্ত ছিলেন।
অতুলপ্রসাদ সেন
জন্ম ২০ অক্টোবর ১৮৭১ ঢাকায়। মৃত্যু ২৬ আগস্ট ১৯৩৪
লখনউয়ে। কবি,
গীতিকার ও সুরকার। পেশাগত জীবনে লখনউ-এর নামি ব্যারিস্টার। তাঁর
নামে সেখানে একটি রাস্তাও আছে। দেশাত্মবোধক গান, ভক্তিমূলক
গান এবং প্রেমের গানই লিখেছেন বেশি। মোদের গরব মোদের আশা আ মরি বাংলা ভাষা,
উঠ গো ভারতলক্ষ্মী, বল বল বল সবে
শতবীণাবেণুরবে, হও ধরমেতে ধীর হও করমেতে বীর, ওগো নিঠুর দরদী, আমার হাত ধরে তুমি, বঁধু এমন বাদলে তুমি কোথা ইত্যাদি বিখ্যাত গানগুলি সব তাঁরই লেখা। গানের
জগতে একটি ধারাই তৈরি হয়ে গিয়েছে অতুলপ্রসাদের গান নামে। নিজেও গাইতে পারতেন।
কয়েকটি গান এবং গীতিকুঞ্জ, এই বই দুটিতে তাঁর সব গান
একত্রিত। প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মিলন প্রতিষ্ঠায় তাঁর অগ্রণী ভূমিকা ছিল এবং এই
সংস্থার মুখপত্র উত্তরা-র তিনি ছিলেন অন্যতম সম্পাদক।