অক্ষয়কুমারে মৈত্রেয় (১৮৬১-১৯৩০) একজন কীর্তিমান লেখক। সাহিত্যসাধনা, সমাজসেবা, প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা, ইতিহাস চর্চায় সমাজ ও জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অক্ষয় কীর্তির অধিকারী হয়ে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় তাঁর অক্ষয় নামের সার্থকতা প্রতিপন্ন করেছেন। তাঁর পিতা মথুরানাথ মৈত্রেয় এবং মাতা সৌদামিনী দেবী।
১৮৬১ সালের ১ মার্চ বর্তমান
বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার শিমুলিয়া গ্রামে মাতার মাতুলালয়ে অক্ষয়কুমারের জন্ম হয়।
তাঁর পৈতৃক নিবাস বর্তমান বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার গুড়নই গ্রামে। নীলকরদের
অত্যাচারে থাকতে না পেরে অক্ষয়কুমারের পিতামহী শ্যামমোহিনী দেবী কুষ্টিয়ার
কুমারখালিতে পিতৃগৃহে আশ্রয় নেন। সে কারণে পিতা মথুরানাথ এবং অক্ষয়কুমার দীর্ঘদিন
কুমারখালিতে বসবাস করেন।
কুমারখালির বঙ্গ বিদ্যালয়ে
শিশু অক্ষয়কুমারের শিক্ষাজীবন শুরু হয়। কাঙাল হরিনাথের এই বিদ্যালয়েই তাঁর
প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হয়। ইতিমধ্যে অক্ষয়কুমারের পিতা কুমারখালিতে শিক্ষকতা ছেড়ে
দেওয়ানি আদালতে চাকরি নেওয়ার সুবাধে পূর্বপুরুষের পৈতৃক নিবাস রাজশাহীতে বসবাস
শুরু করেছেন। রাজশাহীর বোয়ালিয়া গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে ১৮৭৮ সালে অক্ষয়কুমার প্রথম
বিভাগে এন্ট্রান্স এবং ১৮৮০ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে এফ. এ পাশ
করেন। ১৮৮৩ সালে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে
তৃতীয় বিভাগে বি.এ পাশ করেন। অতঃপর ১৮৮৫ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে
বি. এল ডিগ্রি লাভ করে অক্ষয়কুমার রাজশাহী আদালতে আইন ব্যবসায় যোগদান করেন।
কর্মজীবনে প্রবেশ করে অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায় বলে ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বসহ
নানাবিধ বিষয়ে তিনি যে শিক্ষালাভ করেন তা সনদপুষ্ট আনুষ্ঠানিক শিক্ষাকেও হার
মানায়।
এখানে বলা আবশ্যক, অক্ষয়কুমার
মৈত্রেয়-এর আজন্ম লালিত সাহিত্য প্রীতি ও ইতিহাস অনুরাগের কারণে আইন পেশার প্রতি
ঐকান্তিকতা তাঁর কাছে প্রাধান্য পায়নি। সেকারণে সাহিত্যচর্চা ও ঐতিহাসিক গবেষণায়
তিনি অধিকতর মনোযোগী হন। বাংলা ভাষায় প্রাচীন লেখমালা, মুদ্রা ও
অন্যান্য দলিল-দস্তাবেজের সাহায্যে বিজ্ঞান সম্মত উপায়ে ইতিহাস রচনায় অক্ষয়কুমার
মৈত্রেয় পথিকৃৎ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে আধুনিক বাঙালি লেখকদের মধ্যে
শীর্ষস্থানীয় মনে করতেন। অক্ষয়কুমারের প্রকাশিত গ্রন্থ: 'সমরসিংহ' (১৮৮৩), 'সিরাজদ্দৌলা' (১৮৯৮), 'সীতারাম
রায়' (১৮৯৮), 'মীরকাসিম' (১৯০৬), 'গৌড়লেখমালা' (১৯১২), 'ফিরিঙ্গি
বণিক' (১৯২২), 'অজ্ঞেয়বাদ' (১৯২৮)
ইত্যাদি।
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়-এর 'সিরাজদ্দৌলা' একখানি
সাড়া জাগানো ঐতিহাসিক গ্রন্থ। অনেক ইংরেজ ঐতিহাসিক ব্রিটিশ শাসকদের তুষ্ট করতে
বঙ্গের নবাব সিরাজদ্দৌলাকে নির্দয়, উদ্ধত ও
স্বেচ্ছাচারী হিসেবে চিত্রিত করে তাঁর চরিত্রের উপর কালিমা লেপন করেছেন। নবাব সিরাজদ্দৌলা
অন্ধকূপ-হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে এ-সব ঐতিহাসিক প্রচার চালান। অন্ধকূপ হত্যার ঘটনা
যে অলীক সেটা অক্ষয়কুমারের লেখায় প্রমাণিত। বাংলার পাল রাজত্বকাল সম্পর্কেও বহু
অজানা তথ্য তিনি আবিষ্কার করে 'গৌড়লেখমালা' গ্রন্থে
প্রকাশ করেন।
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় 'ঐতিহাসিক
চিত্র' নামে একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা সম্পাদনাও প্রকাশ করতেন। বাংলার প্রাচীন
ইতিহাসের উপকরণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে রাজশাহীতে 'বরেন্দ্র
অনুসন্ধান সমিতি' স্থাপন (১৯১০) তাঁর অন্যতম
মহৎ কীর্তি। ক্রিকেট খেলা, শিল্পকলা এবং রেশমশিল্পেও
তাঁর আগ্রহ ছিল। নানাবিধ সম্মান ও পুরস্কারে বিভূষিত কীর্তিমান লেখক অক্ষয়কুমার
মৈত্রেয় ১৯৩০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পরোলোক গমন করেন।
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখক পরিচিতি –
ড.বাসুদেব রায়ের জন্ম ১৯৬২ সালে। কবিতার মাধ্যমে সাহিত্যের জগতে আত্মপ্রকাশ। প্রথম প্রকাশিত বই মানব' (কাব্যগ্রন্থ), দ্বিতীয় বই রক্তের বাঁধন (উপন্যাস)। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় পদচারণা করলেও প্রবন্ধ সাহিত্যের দিকে তার ঝোঁক বেশি। তদুপরি গবেষণামূলক প্রবন্ধ তথা বই লিখতে তিনি অধিকতর উৎসাহী। গবেষণামূলক বইয়ের পাশাপাশি সাধু-মহাপুরুষদের জীবনী-গ্রন্থ, একাঙ্কিকা ইত্যাদি সম্পাদনাও করেছেন তিনি।
ড.বাসুদেব রায়ের বেশ কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে। হার উল্লেখযোগ্য গবেষণা গুলোর মধ্যে রয়েছে মনসামঙ্গল কাব্যে দেবদেবীর স্বরূপ', চণ্ডীমঙ্গল ও অন্নদামঙ্গল কাব্যে দেবদেবীর স্বরূপ, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে সমাজ-চিত্র ইত্যাদি। তাঁর যৌথ রচনা ও উপেক্ষণীয় নয়।
বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বাসুদেব রায় নিরলস ভাবে লিখে চলেছেন। এছাড়াও নতুন করে তিনি একক ও যৌথভাবে বেশ কয়েকটি গবেষণামূলক কাজে হাত দিয়েছেন। নিয়মিত বিভিন্ন e magazine-এ লেখেন।