কীর্তিশালী কবি নবীনচন্দ্র সেন (১৮৪৭-১৯০৯) -এর কাব্যকীর্তি বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। আবেগ, উচ্ছ্বাস ও ভাবোদ্দীপনা তাঁর কাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাঁকে বাংলা আখ্যান কাব্যের শেষ কবি মনে করা হয়। গাঁথা কাব্য ও মহাকাব্য ছাড়া গীতিকাব্যেও তাঁর দখল ছিল। পাশাপাশি, তিনি কাব্যকুশলতার সঙ্গে মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি-র অধিকারী ছিলেন।
নবীনচন্দ্র সেন ১৮৪৭ সালের
১০ ফেব্রুয়ারি বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার নোয়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ
করেন। ১৯০৯ সালের ২৩ জানুয়ারি চট্টগ্রামেই তাঁর মৃত্যু হয়। চট্টগ্রাম স্কুল থেকে
তিনি ১৮৬৩ সালে প্রবেশিকা পাশ করেন। এরপর তিনি ১৮৬৫ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি
কলেজ (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে এম. এ এবং ১৮৬৮ সালে জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ
ইন্সটিটিউশন থেকে বি. এ পাশ করেন। কর্মজীবনের প্রথমে নবীনচন্দ্র কলকাতার হেয়ার
স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৮৬৮ সালে তিনি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে ডেপুটি
ম্যাজিস্ট্রেটের পদে চাকরি লাভ করেন। তিনি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন ১৯০৪ সালে।
নবীনচন্দ্র সেন ছাত্রাবস্থা
থেকেই সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। ১৮৭১ সালে তাঁর প্রথম গ্রন্থ 'অবকাশরঞ্জনী' (দেশপ্রেম
ও আত্মচিন্তামূলক কবিতা সংকলন) প্রকাশিত হয়। ১৮৭৫ সালে তিনি 'পলাশীর
যুদ্ধ' নামক ঐতিহাসিক আখ্যান কাব্য রচনা করে যথেষ্ট খ্যাতি লাভ করেন। এর মাধ্যমে
তিনি জাতীয়তাবাদী কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে লেখা তাঁর
মহাকাব্যোপম রচনা ত্রয়ী কাব্য- 'রৈবতক' (১৮৮৭), 'কুরুক্ষেত্র' (১৮৯৩) এবং
'প্রভাস' (১৮৯৬)- এও জাতীয় ভাবনার
বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তাঁর আত্মজীবনী 'আমার জীবন' শুধু
একখানি সুখপাঠ্য গ্রন্থই নহে, তৎকালীন
প্রশাসন, রাজনীতি ও সমাজের এক প্রামাণ্য দলিলও বটে। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা
করেন।
'পলাশীর
যুদ্ধ' নবীনচন্দ্র সেনের ঐতিহাসিক গাঁথাকাব্য। পাঁচ সর্গে রচিত এটি একটি
দেশপ্রেমমূলক আখ্যান কাব্য। বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলার ভাগ্য বিপর্যয়ের কাহিনি
অবলম্বনে পরাধীনতার বেদনাকে কবি এই কাব্যে ফুটিয়ে তুলেছেন। স্বদেশ ভাবনার পরিচয়ে
এই কাব্য মহত্তর হয়ে উঠেছে। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪) যথার্থই
লিখেছেন, "পলাশীর যুদ্ধে উপাখ্যান এবং নাটকের ভাগ অতি অল্প, গীত অতি
প্রবল। নবীনবাবু বর্ণনায় এবং গীতিতে একপ্রকার সিদ্ধহস্ত। সেইজন্য 'পলাশীর
যুদ্ধ'এত মনোহর হইয়াছে।"
'পলাশীর
যুদ্ধ' কাব্যে ঘটনা- রূপায়ণে, মোহনলালের
উক্তির মধ্যে দিয়ে কবি নবীনচন্দ্র সেনের স্বদেশভাবনার পরিচয় প্রকাশিত হয়েছে। এই
কাব্য প্রকাশিত হওয়ার পর নবীনচন্দ্র সেন কবি হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। অবশ্য, তরুণ বয়সে
রচিত এই কাব্যটির মধ্যে আবেগের অতিবাদিতা আছে। ইতিহাসের বস্তু সত্য ও কল্পনার
কাব্যসত্যের মিলনেও হয়তো বাধা ঘটেছে। তবু এর উচ্ছ্বসিত স্বদেশপ্রেম একসময় বাঙালি
পাঠককে উদ্বুদ্ধ করেছিল। 'পলাশীর যুদ্ধ' অগ্নিযুগের
বিপ্লবীদের প্রেরণা দিয়েছিল। দীর্ঘকাল ধরে স্কুলে পাঠ্যগ্রন্থরূপে মর্যাদা
পেয়েছিল। এমনকি 'বন্দে মাতরম্' ধ্বনির
মতো এই কাব্য আবৃত্তি করার অপরাধে স্বদেশী আন্দোলনের সময় ব্রিটিশ শাসকের কাছ থেকে
শাস্তি ভোগ করতে হতো।
বাংলা সাহিত্যে 'পলাশীর
যুদ্ধ' কাব্য বিভিন্ন দিক থেকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই কাব্যই নবীনচন্দ্র সেনকে 'জাতীয় কবি'- র
মর্যাদায় উন্নীত করে। তাঁর জীবৎকালেই এর দ্বিতীয় থেকে দশম পরিমার্জি সংস্করণ
প্রকাশিত হয়। এটি বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বেশি পঠিত কাব্যগ্রন্থগুলোর অন্যতম।
পরিশেষে বলা যায়, চাকরি
জীবনের একান্ত অভিস্পিত পদোন্নতিকে বাঁধাগ্রস্ত করে 'পলাশীর
যুদ্ধ' রচনা নবীনচন্দ্র সেনকে বাংলা সাহিত্যে শুধু সুপ্রতিষ্ঠিতই করেনি, এতে তিনি
প্রচণ্ড সাহসিকতা ও অকৃত্রিম দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছেন। বলাই বাহুল্য, জাতীয়তা, দেশপ্রেম
ও স্বজাতিপ্রেমকে যাঁরা সাহিত্য সাধনার মূল প্রেরণারূপে গ্রহণ করেছেন, নবীনচন্দ্র
সেন তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য।
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখক পরিচিতি –
ড.বাসুদেব রায়ের জন্ম ১৯৬২ সালে। কবিতার মাধ্যমে সাহিত্যের জগতে আত্মপ্রকাশ। প্রথম প্রকাশিত বই মানব' (কাব্যগ্রন্থ), দ্বিতীয় বই রক্তের বাঁধন (উপন্যাস)। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় পদচারণা করলেও প্রবন্ধ সাহিত্যের দিকে তার ঝোঁক বেশি। তদুপরি গবেষণামূলক প্রবন্ধ তথা বই লিখতে তিনি অধিকতর উৎসাহী। গবেষণামূলক বইয়ের পাশাপাশি সাধু-মহাপুরুষদের জীবনী-গ্রন্থ, একাঙ্কিকা ইত্যাদি সম্পাদনাও করেছেন তিনি।
ড.বাসুদেব রায়ের বেশ কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে। হার উল্লেখযোগ্য গবেষণা গুলোর মধ্যে রয়েছে মনসামঙ্গল কাব্যে দেবদেবীর স্বরূপ', চণ্ডীমঙ্গল ও অন্নদামঙ্গল কাব্যে দেবদেবীর স্বরূপ, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে সমাজ-চিত্র ইত্যাদি। তাঁর যৌথ রচনা ও উপেক্ষণীয় নয়।
বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বাসুদেব রায় নিরলস ভাবে লিখে চলেছেন। এছাড়াও নতুন করে তিনি একক ও যৌথভাবে বেশ কয়েকটি গবেষণামূলক কাজে হাত দিয়েছেন। নিয়মিত বিভিন্ন e magazine-এ লেখেন।