ধারাবাহিক বড় গল্প
৪র্থ ও শেষ পর্ব
অলকেশের পিছনে পিছনে আমরা চললাম। মনে পড়ল সুকুমার রায়ের কবিতা
“পাকাপাকি”। “আম পাকে বৈশাখে,কুল পাকে ফাগুনে….কাঁচা ইট
পাকা হয়,পোড়ালে তা আগুনে”।
সত্যিই দেখার মতো! ভাঁটির
জন্য সবাই প্রস্তুত। গিয়ে দেখলাম. অনেকখানি জায়গা জুড়ে ইটের দেওয়াল তোলা,ওটাই নাকি
ভাঁটিখানা! তার ভেতরে আলাদা আলাদা চেম্বার করা। দেওয়াল জুড়ে খবরের কাগজ আঠা দিয়ে আটকানো।
কেন!? তা আমি আর
জিজ্ঞাসা করিনি। কাঁচা ইট দু-দিক থেকেই সাজানো প্রায় শেষের পর্যায়ে। আমার কাছে ফায়ারিং
প্লেসে কাঁচা ইট সাজানোটা অপূর্ব দৃশ্য বলে মনে হল। ভালো করে লক্ষ্য করলাম,যেন এসব কিছুর
মধ্যেই একটা শিল্প-সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে।
ব্যস……এবার চেম্বার বন্ধ হল। সবাই নিচে থেকে
উপরে উঠে এলো।
বন্ধ চেম্বারের উপর বালি তার উপর মাটি চাপা দেওয়া হল। কিন্তু
ওই চাপা দেওয়ার সময় দেখলাম মাঝে মাঝে পাঁচ-সাত ইঞ্চি ডায়ামিটারের গর্ত রাখা হয়েছে।
উপর থেকে কয়লা ফেলার জন্য।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম,”কয়লা ফেলা হচ্ছে কেন”?!!!!
ম্যানেজার-বাবু বললেন
কয়লাটাই তো জ্বালানি! নিচে কয়লা সাজিয়ে তার উপর যেমন ইট সাজানো হয়েছে,উপর থেকেও
তেমন কয়লা দিতে হয়। উপর-নীচে কয়লার মাঝে থাকবে ইট।
এবার ওই কয়লা ফেলার গর্তগুলোকে মোটা-ভারী,উপরের দিকটা
সূচলো আংটা লাগানো ঢাকনা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হল। যাতে ভেতরের আগুন বাইরে বেরিয়ে আসতে
না পারে। এরকম একেকটা চেম্বারে কয়েক লক্ষ করে কাঁচা ইট পোড়ানো হয়। পাশাপাশি এরকম অনেকগুলো
করে চেম্বার আছে।
আমার কত্তা বলল বাঃ! অলকেশ,তোমার এখানে
না আসলে এই বিরাট কর্মকাণ্ড দেখতে পেতাম না! অজানা অনেককিছুর মধ্যে অন্তত: এই জিনিসটা
নিজের চোখে দেখতে পেলাম!
ফায়ারিং স্টার্ট বলে ম্যানেজার বাবু সুইচ দেবার আগেই সবাইকে কিছুটা দূরত্বে সরে যেতে হয়। তারপরেও ওখানে বেশ
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম সবার সাথে।
অলকেশ বলল চল এবার বাড়ি ফিরে যাই। আমি বললাম একবার গঙ্গার ধারে
যাবো। সবসময় তো আসা হয়না। গঙ্গার জলে সূর্যাস্ত দেখবো আমি।
সূর্য পশ্চিম আকাশ আলো
করে অস্ত যাছে। গঙ্গার বুকে অস্ত-সূর্যের আলোর ছটায় তখন চারিদিক আলোকিত হয়ে উঠেছে।
জলের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে যেন জল নয় গলানো সোনা! এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে…….মাঝখানে
দু-তিনটে নৌকা,মাঝে অনেকটা দূরত্ব রেখে চলেছে। নৌকা ও তার মাঝির শুধু কালো
অবয়ব ছাড়া কিছু বোঝা যাচ্ছে না। একেবারে যেন আঁকা ছবি বলে মনে হচ্ছে। দূরে দেখা যাচ্ছে
কল্যাণী সেতু। সে এক অসাধারণ দৃশ্য। যত দূর চোখ যায় দেখছি আর দেখেই চলেছি। আবার অলকেশ
বলল,এবার চল ফিরবো।
আমি বললাম,হ্যাঁ চল। এবার ফিরতেই হবে,নইলে রুপা
এবার নিজেই চলে আসবে আমাদের নিতে।
ফিরে আসছি,আবার দেখতে
পেলাম রূপমতিকে ওই একই জায়গায় বসে ইটের ফর্মা তৈরি করে চলেছে। পড়ন্ত সূর্যের আলো ওর
চোখে মুখে বুকের উপর দিয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে। ভারী সুন্দর দেখতে লাগছে ওকে! বাকি
মহিলা,পুরুষ এবং বেশ কিছু ছোট ছেলে-মেয়ে তখনও কাজ করেই চলেছে।
এমনকি অস্ত সূর্যের
আলো এসে পড়েছে সারি সারি কাঁচা ইটের উপর। তার মাঝে বসে আছে রূপমতি হাড়ি,কড়া, উনুন আর কাঠের
ফর্মা নিয়ে। আর চারপাশে একদম ছোট বাচ্চাগুলো খেলে বেড়াচ্ছে।
ইট-ভাঁটা থেকে ফিরতেই
রুপা বকাবকি শুরু করলো অলকেশকে। বললো,তুমি কেমন মানুষ গো! দিদিদের ম্যানেজার বাবুর কাছে রেখে দিয়ে
নিজের কাজে চলে গেলে! আর ওরা সারাদিন ইট-ভাঁটায় রইলো খাওয়া-দাওয়া কিছুই হল না।
আমি বললাম,রূপা অলকেশের কোনও দোষ নেই। আমরা খাওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছে।
”যা দেখেছি মন ভরে গিয়েছে গো”! তাছাড়া,তুমি যা পেটভরা ব্রেকফাস্ট করিয়েছো তাতে এখনও খিধে হয় নি। এবার
শুধু চা খাবো। তারপর ফ্রেশ হয়ে এসে জমিয়ে গল্প হবে। সঙ্গে মুড়ি মাখা।
সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত
আমাদের আড্ডা হয়েছিল। কত কথা, কত গল্প,কত স্মৃতি মনে ভিড় করে আসছিল। অলকেশ-রুপার বিয়ের গল্প,আমাদের বিয়ের
গল্প,ওদের পারিবারিক গল্প,আরও কত কিছুর গল্প।
অলকেশ-রুপা দারুণ খুশি
আমাদের দুজনকে পেয়ে। তবে,সব ছাপিয়ে মনটা একটু ভারাক্রান্ত হয়েছিল যখন অলকেশ বলল,জানিস আমাদের
সবকিছু পাওয়ার মধ্যে শুধু মা-বাবা ডাকটাই অপূর্ণ থেকে গেলো।
কথা থামিয়ে দিয়ে রুপা
বলল না গো দিদি…….. বছর কয়েক আগেও কখনো-সখনো মনে হতো কিন্তু এখন আর মনে হয় না।
কারণ,এই ইট-ভাঁটার মধ্যে আমি স ওওও ব কিছু পেয়েছি। আমার নিজের কেউ
থাকলে বোধহয় এই ইট-ভাঁটার মানুষগুলোর সঙ্গে আমি এভাবে মিশতে পারতাম না। ওরাই আমায়
“মা” বলে। একের মধ্যে আটকে পড়িনি এটা ভালোই হয়েছে।
আমি বললাম ঠিকই বলেছো। কিন্তু অলক্ষ্যে রুপাকে উপলব্ধি করলাম।
অলকেশ বলল হ্যাঁ,এটা একদম ঠিক কথা যে,রুপা ওদের খুব ভালোবাসে। ওদের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে নিয়েছে। একথা
স্বীকার করছি,বাবা মারা যাওয়ার পর,রুপার জন্যই এই ইট-ভাঁটা এতবড় হয়েছে।
পরেরদিন আমরা ব্রেকফাস্ট
করেই বেরিয়ে এলাম। খুব ভালো লেগেছিল অলকেশের বাড়িতে গিয়ে। মনে বেশ একটা রেশ থেকে গিয়েছে।
আমি ফিরে এসে যখন “ইট-ভাঁটার
গল্প” লিখতে বসেছি,তখন রূপমতি-মঙ্গলের ভালোবাসা আমার কাছে একটা কাহিনী হয়ে উঠলো।
যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি.........
চাঁদনী রাত,দুটো সদ্য-যৌবন ছেলে মেয়ে কি উচ্ছলতায় সারা ইট-ভাঁটায় এদিক ওদিক
ছুটে বেড়াচ্ছে,ধরাধরি করছে! চাঁদের আলো পড়েছে রূপমনির লজ্জানত মুখে। তার দীঘল
কালো চোখ,টিকলো নাক,আর কষ্টি কালো মুখখানা মঙ্গল দু-হাতে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
একমাথা অযত্নের ঝাঁকড়া চুল মঙ্গল তার রূপমতিকে জাপটে জড়িয়ে ধরতে গেলে সে হাত ছাড়িয়ে
পালিয়ে যেতে যেতে কপট লজ্জায় ঝাঁপিয়ে পড়ে মঙ্গলের বুকে।
কখনও নিকষ কালো অমাবস্যার
অন্ধকারে ইট-ভাঁটা ঘুমিয়ে পড়লে চুপি চুপি দুটো কালো শরীর মিশে যাচ্ছে অন্ধকারে। ইট-ভাঁটাই
ওদের সব কিছু দিয়েছে,সাক্ষী থেকেছে এক প্রেম-কাহিনীর। ওদের বিয়ে হয়েছে,সংসার হয়েছে,উত্তরাধিকারী
আসার খবরও এসেছে। আর কদিন পরেই পৃথিবীর আলো দেখবে ওদের সন্তান। নবজাতকের জন্য রইলো
আমার প্রাণভরা শুভেচ্ছা ও আশীর্বাদ।।
সমাপ্ত
লেখিকার অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন ।
লেখিকার পরিচিতি –
লেখিকার জীবনের সঙ্গে গল্প অঙ্গাঙ্গিকভাবে জড়িয়ে আছে। যা
দেখেন, যা শোনেন, যা শোনেন, যা কিছু স্মৃতির পাতায় জড়িয়ে আছে মনের সাথে,তাই নিয়ে লিখতেই বেশি পছন্দ করেন।
লেখা শুরু
স্কুল-ম্যাগাজিন, কলেজ -ম্যাগাজিন দিয়ে। বর্তমানে
কিছু লেখা প্রকাশিত হচ্ছে কয়েকটি মাসিক-ত্রৈমাসিক পত্রিকায়। পাখিদের নিয়ে অনেক লিখেছেন। গল্প, ভ্রমণ, ফিচার, কবিতা
নিয়মিতভাবে লিখে থাকেন। দিল্লি থেকে প্রকাশিত কলমের সাত রঙ এবং তাৎক্ষণিক ডট কম-এর
নিয়মিত লেখিকা।